সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাকে ঘিরে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভাগ-১ এর আওতাধীন ১৫ নং পোল্ডারের উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ কেটে যত্রতত্র নাইন্টি পাইপ স্থাপনে ঝুঁকিতে পড়ছে হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। চিংড়িঘেরে নদীর লবণ পানি সরবরাহের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীরা সম্প্রতি বাঁধের উপরিভাগে দেওয়া ব্লক সরিয়ে বাঁধ কেটে ও ছিদ্র করে সেখানে এসব নাইনটি স্থাপন করেছে। গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা, ডুমুরিয়া, চাদনীমুখা, ৯ নং সোরাসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব নাইন্টি পাইপ স্থাপন করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপকূলের বেড়িবাঁধ ভাঙন প্রতিরোধে সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-১ এর আওতাধীন ১৫ নম্বর পোল্ডারে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে মোট ১ হাজার ২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।
তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই গাবুরা ইউনিয়নকে সুরক্ষিত করতে নির্মিত মেঘা প্রকল্পের এই বেড়িবাঁধের শতাধিক জায়গায় কাটাছেঁড়া করে বসানো হয়েছে নাইন্টি পাইপ। অনেক স্থানে নৌকা আটকানোর জন্য বাঁধ খুঁড়ে খুঁটি বসানো হয়েছে। যা হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধকে দুর্বল করে তুলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ঘের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে বাঁধটি হুমকির মুখে পড়ছে।
গাবুরার চাঁদনীমুখা বাজার থেকে পার্শ্বেমারি পর্যন্ত খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের তিন কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ কেটে অন্তত ২০ থেকে ৩০টি স্থানে নাইন্টি পাইপ বসাতে দেখা গেছে। ৯ নং সোরা ও চকবারা এলাকার খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ কেটে বসানো হয়েছে ১২ থেকে ১৫টি নাইন্টি পাইপ। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ৯ নং সোরা, পার্শ্বেমারির শেখ বাড়ি এলাকায় বাঁধ ভেঙে গাবুরা ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছিল। ভেঙে যাওয়া স্থান পরে মেরামত করে পাউবো। সেসব জায়গায়ও নাইন্টি পাইপ বসিয়ে লোনাপানি উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেড়িবাঁধে অবৈধ ‘নাইন্টি’ পাইপ বসিয়ে নদ-নদী থেকে লবণ পানি প্রবেশ করিয়ে মৎস্যচাষ করছেন। তাদের ভাষ্য, এর ফলে ইউনিয়নে চলমান হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত টেকসই বেড়িবাঁধ ক্ষতির মুখে পড়ছে।
এ বিষয়ে গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম জানান, ইতোমধ্যে গাবুরা ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের ওপর স্থাপিত সব অবৈধ ‘নাইনটি’ অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতেও কোনো ব্যক্তি বেড়িবাঁধ বা জনসাধারণের চলাচলের পথে অবৈধভাবে ‘নাইনটি’ স্থাপন করতে পারবেন না।
তিনি জানান, মৎস্যঘের পরিচালনার জন্য বিদ্যমান মিনি স্লুইস গেট ও সাধারণ স্লুইস গেট ব্যবহার করতে হবে। কেউ আইন অমান্য করে প্রভাব খাটিয়ে বা জোরপূর্বক নাইন্টি পাইপ বসালে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নদী, বেড়িবাঁধ, সড়ক ও পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে আইন মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজররুল ইসলাম বলেন, “গাবুরার উন্নয়ন ও মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। এলাকার স্বার্থই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন টেকসই বেড়িবাঁধ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়-এমন কোনো অবৈধ কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না।”
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ- ১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান সরদার বলেন, “এখনো পর্যন্ত গাবুরার চারপাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। অনেকে নৌকা আটকানোর জন্য খুঁটি স্থাপনের পাশাপাশি কয়েকজন নির্মাণাধীন বাঁধ কেটে পাইপের সাহায্যে নাইনটি স্থাপন করেছে। বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিজে থেকে নাইনটিগুলো অপসারণে নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও স্থানীয়রা তাতে কর্ণপাত করেনি। বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে গত ৬ জুলাই সকাল থেকে বাঁধের জন্য ক্ষতিকর নাইনটি গুলো অপসারণ করা শুরু হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা, ডুমুরিয়া, চাদনীমুখা ও ৯ নং সোরা এলাকার বাঁধ হতে ১২টি নাইনটি অপসারণ করা হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

